
মাঠে নেমে আগের মতো কাজ করার শক্তি নেই, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। তবুও অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা আর দুই ছেলের সহযোগিতায় কক্সবাজারের টেকনাফে আগাম তরমুজ চাষ করে দৃষ্টান্ত দেখালেন প্রবীণ কৃষক চাঁন মিয়া। সময়ের আগেই তরমুজ বাজারে তুলে ভালো দামে বিক্রির মাধ্যমে তিনি যেমন লাভের মুখ দেখছেন। তার মতো আশার আলো দেখছেন এলাকার শত শত কৃষক।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের নাজির পাড়ার বাসিন্দা চাঁন মিয়া (৬০) দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। চলতি মৌসুমে তিনি এক একর জমিতে আগাম তরমুজ চাষ করেন। প্রায় তিন মাসে এই জমিতে তার খরচ হয়েছে এক লাখ টাকা। বর্তমানে ক্ষেতের তরমুজ বিক্রির প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। পুরো ক্ষেতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা থেকে পৌনে ৩ লাখ টাকা আশা করছেন তিনি।
বয়সের কারণে সরাসরি মাঠে নিয়মিত কাজ করতে না পারলেও চাঁন মিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন তার দুই ছেলে। পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফলন হয়েছে ভালো। ক্ষেতে চার হাজারের বেশি তরমুজ ধরেছে বলে জানান এই কৃষক।
চাঁন মিয়া বলেন, ‘‘আমার বয়স হয়েছে, তাই দুই ছেলে নিয়ে তরমুজের ক্ষেত করেছি। গত বছরের মতো এবারো সফল হয়েছি। কৃষি অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী জমি তৈরি করেছি, ভালো বীজ ব্যবহার করেছি। শুরুতে ৫ লাখ টাকা দাম চেয়েছিলাম, পরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ঠিক করেছি।”
তিনি জানান, সঠিক সময়ে জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের বীজ এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণেই এবার ফলন ভালো হয়েছে। তার এই সাফল্যে নাজির পাড়া ও আশপাশের এলাকার কৃষকদের মধ্যে আগাম তরমুজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
চাঁন মিয়ার ছেলে মো. আবছার বলেন, “আব্বু আগের মতো মাঠে কাজ করতে পারেন না। আমরা দুই ভাই মিলে পরিশ্রম করেছি। তিন মাসে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কৃষি অফিসারের পরামর্শে কাজ করায় ফলন ভালো হয়েছে।”
এদিকে, তরমুজ ব্যবসায়ীরাও স্থানীয় ফলনে সন্তুষ্ট। ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার টেকনাফে তরমুজের ফলন ভালো। নাজির পাড়ার এই ক্ষেতটি আমি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় কিনেছি। সাবরাং ও শাহ পরীর দ্বীপ থেকেও ক্ষেত কিনেছি। প্রায় ১৫ বছর ধরে ফলের ব্যবসা করছি। টেকনাফের তরমুজ দিয়েই আগামী দুই মাস বাজার চলবে।”
তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং পিস হিসেবে ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় তরমুজ বিক্রি হচ্ছে। টেকনাফে উৎপাদন শেষ হলে নোয়াখালী, ভোলা ও খুলনা থেকে তরমুজ সংগ্রহ করা হয়।”
অপর ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, “আগে বাইরে থেকে তরমুজ এনে টেকনাফে বিক্রি করতে হতো। এখন স্থানীয়ভাবে ফলন হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ী দুপক্ষই লাভবান হচ্ছেন।”
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, চলতি মৌসুমে টেকনাফ উপজেলায় প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে আগাম তরমুজের চাষ হয়েছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় তরমুজ চাষ হচ্ছে। এবছর প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে কৃষকেরা তরমুজ বাজারজাত করতে শুরু করেছেন। কেজি প্রতি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় তারা লাভবান হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনা ও উন্নত জাতের বীজের বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নোনা পানি প্রবেশ করলে কিছু সমস্যা হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী বছর তরমুজ চাষ আরো বাড়বে।

পাঠকের মতামত